কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? জানুন নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (নওগাঁ নোটারি পাবলিক)
আমাদের সমাজে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ শব্দটি খুবই পরিচিত। বিশেষ করে যখন কোনো যুগল পরিবারের অমতে বিয়ে করেন, তখন তারা আইনি সুরক্ষার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হন। আমি নওগাঁ জজ কোর্টের একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আজ আপনাদের জানাব কোর্ট ম্যারেজ বা বিবাহের হলফনামা (Affidavit) করার সঠিক নিয়ম এবং এর আসল খরচ সম্পর্কে।
কোর্ট ম্যারেজ আসলে কী?
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—কোর্ট ম্যারেজ করলেই বিয়ে হয়ে যায়। আসলে আইনত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলে কোনো বিয়ের অস্তিত্ব নেই। ধর্মীয় মতে বিয়ে করার পর (যেমন মুসলিমদের ক্ষেত্রে কাজি অফিসে নিকাহনামা), সেই বিয়ের ঘোষণা দিয়ে নোটারি পাবলিকের সামনে যে হলফনামা করা হয়, তাকেই সাধারণ মানুষ কোর্ট ম্যারেজ বলে। এটি মূলত বিয়ের একটি শক্তিশালী আইনি দস্তাবেজ বা প্রমাণ।
বিয়ের জন্য ন্যূনতম বয়স কত?
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী:
* ছেলের বয়স: অবশ্যই পূর্ণ ২১ বছর হতে হবে।
* মেয়ের বয়স: অবশ্যই পূর্ণ ১৮ বছর হতে হবে।
বিয়ের সময় উভয় পক্ষকে মানসিকভাবে সুস্থ এবং স্বেচ্ছায় বিয়ের সিদ্ধান্তে একমত হতে হবে। বয়স কম বা গোপন করে বিয়ে করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
কোর্ট ম্যারেজ করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
সঠিক কাগজপত্র ছাড়া কোর্ট ম্যারেজ করা সম্ভব নয়। আপনার সাথে নিচের নথিগুলো থাকতে হবে:
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম সনদ: বয়স প্রমাণের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
২. পাসপোর্ট সাইজ ছবি: বর ও কনে উভয়ের অন্তত ২-৩ কপি ছবি।
৩. সাক্ষী: অন্তত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী এবং তাদের এনআইডি কার্ডের ফটোকপি।
৪. বিশেষ ক্ষেত্রে: আগের বিয়ে ভেঙে গিয়ে থাকলে তালাকনামা (ডিভোর্স পেপার) অথবা স্বামী/স্ত্রী মৃত হলে মৃত্যু সনদ প্রয়োজন হবে।
কোর্ট ম্যারেজ বা হলফনামার খরচ কত?
অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা যাক:
* সরকারি ফি: হলফনামার জন্য স্ট্যাম্প ও নোটারি ফি সরকার নির্ধারিত হলেও, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে আইনজীবীর ফি এবং ড্রাফটিং খরচ যুক্ত হয়।
* মোট খরচ: সাধারণত একটি হলফনামা তৈরি ও সম্পন্ন করতে ১২০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকার মতো খরচ হতে পারে (স্থান ও আইনজীবী ভেদে এটি কম-বেশি হয়)।
* সতর্কতা: যদি কাজি অফিসের মাধ্যমে কাবিননামা বা নিকাহনামা রেজিস্ট্রি করেন, তবে কাবিননামায় উল্লিখিত ‘দেনমোহর’-এর পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সরকারি ফি আলাদাভাবে যুক্ত হবে।
অন্য পোস্ট – ফ্রিল্যান্সিং বনাম চাকরি | ক্যারিয়ার হিসেবে কোনটি আপনার জন্য সেরা?
বিবাহের হলফনামা বা কোর্ট ম্যারেজের নমুনা (নওগাঁ নোটারি পাবলিক)
নিচে একটি আদর্শ ড্রাফট দেওয়া হলো যা সাধারণত আমরা নওগাঁ জজ কোর্টে ব্যবহার করে থাকি।
মোকাম নোটারী পাবলিক এর কার্যালয়, নওগাঁ
“এফিডেভিট/বিবাহের ঘোষণা/কোর্ট ম্যারেজ”
আমরা
১। মোছাঃ ________, বয়স- ১৮ বছর, পিতা- ______, মাতা__________, সাং- _____, পোঃ ________, থানা- নওগাঁ সদর, জেলা- নওগাঁ, ধর্ম- ইসলাম, জাতীয়তা- বাংলাদেশী।
২। মোঃ _______, বয়স- ২১ বছর, পিতা- __________, মাতা- _______, সাং- _______, পোঃ _______, থানা- নওগাঁ সদর, জেলা- নওগাঁ, ধর্ম- ইসলাম, জাতীয়তা- বাংলাদেশী।
আমরা প্রতিজ্ঞা পূর্বক ঘোষণা করিতেছি যে,
আমরা উভয়েই সাবালক ও সাবালিকা। আমাদের ভাল মন্দ বুঝিবার মত যথেষ্ট জ্ঞান বুদ্ধি রহিয়াছে। আমাদের দুজনের বাড়ী পাশাপাশি হওয়ায় আমরা উভয়েই একে অপরের সহিত দেখাশুনার এবং কথাবার্তার ফলে আমাদের মধ্যে প্রেম ভালবাসা সৃষ্টি হয়। আমাদের ভালোবাসা এত গভীর যে, আমরা একে অপরকে না দেখে এক মুহূর্ত থাকতে পারি না। আমরা আমাদের এই ভালবাসাকে আইনগত মর্যাদা দেওয়ার ও চিরস্থায়ী করার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ মৌলভী দ্বারা ইসলামী শরীয়তের বিধান মোতাবেক ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা দেন মোহর ধার্য্যে নগদ নাকফুল বাবদ ১,০০০/- (এক হাজার) টাকা প্রদানে অবশিষ্ট ৯৯,০০০/- (নিরানব্বই হাজার) টাকা বাকী রাখিয়া ইজাব কবুলের মাধ্যমে আমরা অদ্যই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছি এবং পরবর্তীতে আমরা আমাদের বিবাহ রেজিষ্ট্রী কাজির দ্বারা রেজিষ্ট্রী করিয়া লইব। বর্তমানে আমরা বৈধ স্বামী স্ত্রী।
আমরা আরও ঘোষণা করিতেছি যে, এই বিবাহের ব্যাপারে আমাদের কেহ কোনরূপ প্ররোচনা দেয় নাই কিংবা আমাদেরকে কেহ ফুসলাইয়া বিবাহ দেই নাই। আমরা স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে এবং অন্যের বিনা প্ররোচনায় অত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছি। আমাদের বিবাহের ব্যাপারে যদি কেউ কখনও কোন দিন, কোন আদালতে মামলা মোকদ্দমা করে তাহা আদালতে অগ্রাহ্য বলিয়া গণ্য হইবে। ভবিষ্যৎ আইনগত জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে অত্র এফিডেভিট এর মাধ্যমে বিবাহের ঘোষণা প্রদান করিলাম।
“সত্যপাঠ”
অত্র এফিডেভিটের সকল বিবরণ আমাদের জ্ঞান, বিশ্বাস ও অবগতি মতে সত্য। অত্র সত্যতায় নওগাঁ নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকিয়া নিজ নিজ নাম স্বাক্ষর/সহি করিলাম।
এফিডেভিটকারীদ্বয় সহি করিলে
আমি তাহাদের সনাক্ত করিলাম।
তারিখঃ ________________________
এফিডেভিটকারীদ্বয়ের স্বাক্ষরঃ
১। ______________________________
২। ______________________________
নোটারী পাবলিক / এ্যাডভোকেট / জজ কোর্ট নওগাঁ স্বাক্ষর ও সীল
____________________________________
কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও পরামর্শ
আমি নওগাঁ জজ কোর্টে কাজ করার সুবাদে অনেক জটিলতা দেখেছি। তাই আপনাদের প্রতি আমার কিছু ব্যক্তিগত পরামর্শ:
১. ভুয়া দালালের খপ্পরে পড়বেন না: অনেক সময় দালালেরা ভুয়া বয়স বা ভুয়া সাক্ষী দিয়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার লোভ দেখায়। এটি করবেন না, কারণ ভুয়া কাগজে বিয়ে করলে পরবর্তীতে জেল-জরিমানা হতে পারে।
২. কাজি অফিসের রেজিস্ট্রেশন: শুধু কোর্ট ম্যারেজ করে বসে থাকবেন না। অবশ্যই কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি (কাবিননামা) করে নেবেন। কাবিননামা ছাড়া শুধু কোর্ট ম্যারেজের হলফনামা দিয়ে কাবিননামার সুফল পাওয়া যায় না।
৩. অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা: যেকোনো আইনি জটিলতা এড়াতে সরাসরি একজন রেজিস্টার্ড আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
আমার মতামত
আইন মেনে বিয়ে করা আপনার নাগরিক অধিকার। সঠিক নিয়ম জেনে এবং সঠিক কাগজপত্র দিয়ে বিয়ে করলে ভবিষ্যতে কোনো আইনি ঝামেলায় পড়ার ভয় থাকে না। এই তথ্যগুলো যদি আপনার উপকারে আসে, তবে পরিচিতদের সাথে শেয়ার করে তাদেরও সচেতন করুন।

Mithu Babu 


















