০৪:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে – আইনের ব্যাখ্যা

  • Mithu Babu
  • Update Time : ০৭:১৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৭ Time View

ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে – আইনের ব্যাখ্যা

ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে – আইনের ব্যাখ্যা

একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে নওগাঁ জজ কোর্টে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত নিয়ে বাবা-মায়ের লড়াইটা কতটা আবেগঘন আর জটিল হয়। অনেক সময় আইনি অস্পষ্টতার কারণে সন্তানকে কাছে পাওয়া নিয়ে উভয় পক্ষই বিভ্রান্তিতে থাকেন।
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে এই বিষয়টি নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করছি।

সন্তানের হেফাজত বা জিম্মাদারি

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার— অভিভাবকত্ব (Guardianship) এবং হেফাজত (Custody) এক জিনিস নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বাবা সবসময় সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক। মা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তানকে কাছে রাখার অধিকার বা ‘হিজানত’ (Hizanat) লাভ করেন।

মা কখন সন্তানকে কাছে পাবেন?

সাধারণত সন্তানের লিঙ্গভেদে মা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত তাদের কাছে রাখার অধিকারী হন:
★ ছেলে সন্তান: ৭ বছর বয়স পর্যন্ত।
★ মেয়ে সন্তান: বয়ঃসন্ধি বা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত।
তাহলে প্রশ্ন থেজেই যায় – ৭ বছর পর কি মা সন্তানকে রাখতে পারেন না?
নওগাঁ জজ কোর্টে এমন অনেক মামলা আমি দেখেছি যেখানে মা নির্দিষ্ট বয়সের পরেও সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পেরেছেন। এখানে আদালত একটি মূলনীতি অনুসরণ করে: “The Welfare of the Child” বা সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ। যদি আদালত মনে করে মা বা বাবার কাছে থাকলে সন্তানের শারীরিক বা মানসিক উন্নতি বেশি হবে, তবে আদালত প্রচলিত বয়সের সীমা শিথিল করে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ এর ১৭/২৫ ধারা

এই আইনে আদালতে যখন কোনো সন্তানের হেফাজত নিয়ে মামলা হয়, তখন এই আইনের ১৭ ধারা এবং ২৫ ধারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!
১৭ ধারায় কি আছে?
এই ধারা অনুযায়ী আদালত যখন কোনো অভিভাবক নিয়োগ করেন, তখন আইনের চেয়ে ‘সন্তানের কল্যাণ’ কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ ৭ বছর পার হলেও যদি দেখা যায় মায়ের কাছে থাকা টা বাচ্চার জন্য বেশি নিরাপদ। তাহলে আদালত মাকেই হেফাজত দিতে পারেন।

অন্য পোস্ট – নামজারি না করে কি ওয়ারিশি জমি বন্টননামা করা যায় কি? আইনি সমাধান জানুন

২৫ ধারায় কি আছে?
যদি সন্তান কে তার বৈধ হেফাজতকারী (যেমন মা / বাবা) কাছে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে এই ধারার অধীনে সন্তান কে ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

মা কখন সন্তানের হেফাজত হারান?

আদালতে কাজ করার সময় দেখেছি, কিছু বিশেষ কারণে মা তার হেফাজতের অধিকার হারাতে পারেন –
★ মা পুনরায় বিয়ে করলেঃ মা যদি এমন কাউকে বিয়ে করেন যিনি সন্তানের রক্তের সম্পর্কের কেউ নয় (যেমন: সন্তানের চাচা বা মামা বাদে অন্য কেউ), তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।
★ অশোভন জীবনযাপনঃ মায়ের চরিত্র বা জীবনযাপন যদি সন্তানের নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর হয়। তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।
★ সন্তানের অবহেলাঃ মা যদি সন্তানের যত্ন নিতে ব্যর্থ হয় বা সন্তান কে অযত্নে রাখে। তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।

বাবার অধিকার ও দায়িত্ব

সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও বাবা তার প্রাকৃতিক অভিভাবক হিসেবে বহাল থাকেন। একজন বাবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব ও অধিকার হলো – সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও সন্তানের পড়ালেখা, খাবার ও চিকিৎসার খরচ (ভরণপোষণ) বাবাকেই দিতে হবে। এরপর সন্তানের সাথে বাবার দেখা করার অধিকার (Visitation Right), মা কোনো ভাবেই সন্তানের সাথে বাবার দেখা করতে বাধা দিতে পারবে না। সাধারণত আদালত বাবা ও সন্তানের দেখা করার সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দেন।

আইনি জটিলতা এড়াতে আপনার করণীয়

যদি পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়, তবে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে দ্রুত ‘গার্ডিয়ান পিটিশন’ দায়ের করা উচিত। বিচারক মহোদয় সবসময় বাচ্চার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই রায় দেন।

একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ

আমার আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি সকল বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দেই –
ডিভোর্স আপনাদের মধ্যে হয়েছে বরং সন্তানের সাথে নয়। অর্থাৎ সন্তানের আপনাদের সম্পর্কের সাথে তুলনা করে সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না। অর্থাৎ আপনাদের সন্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
★ পারিবারিক আইনের লড়াই দীর্ঘ মেয়াদী হয়। যদি সম্ভব হয়, উভয় পক্ষ বসে বা আইনজীবীর সহযোগিতায় সমাধানে আসলে, সন্তানের উপর এর প্রভাব পড়ে না। এজন্য আপস-মীমাংসায় সমাধান করুন।

অন্য পোস্ট – পারিবারিক আপীল ও শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের সার্টিফাইড কপি এখন কোথায় পাবেন? জেনে নিন।

এই প্রতিবেদন টি শেয়ার করে সকল কে জানার সুযোগ করে দিন এবং আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন।

Spread the love

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

mithu Babu

ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে – আইনের ব্যাখ্যা

Update Time : ০৭:১৯:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ডিভোর্সের পর সন্তান কার কাছে থাকবে – আইনের ব্যাখ্যা

একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে নওগাঁ জজ কোর্টে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, ডিভোর্সের পর সন্তানের হেফাজত নিয়ে বাবা-মায়ের লড়াইটা কতটা আবেগঘন আর জটিল হয়। অনেক সময় আইনি অস্পষ্টতার কারণে সন্তানকে কাছে পাওয়া নিয়ে উভয় পক্ষই বিভ্রান্তিতে থাকেন।
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের আলোকে এই বিষয়টি নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করছি।

সন্তানের হেফাজত বা জিম্মাদারি

শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার— অভিভাবকত্ব (Guardianship) এবং হেফাজত (Custody) এক জিনিস নয়। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, বাবা সবসময় সন্তানের স্বাভাবিক অভিভাবক। মা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সন্তানকে কাছে রাখার অধিকার বা ‘হিজানত’ (Hizanat) লাভ করেন।

মা কখন সন্তানকে কাছে পাবেন?

সাধারণত সন্তানের লিঙ্গভেদে মা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত তাদের কাছে রাখার অধিকারী হন:
★ ছেলে সন্তান: ৭ বছর বয়স পর্যন্ত।
★ মেয়ে সন্তান: বয়ঃসন্ধি বা সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত।
তাহলে প্রশ্ন থেজেই যায় – ৭ বছর পর কি মা সন্তানকে রাখতে পারেন না?
নওগাঁ জজ কোর্টে এমন অনেক মামলা আমি দেখেছি যেখানে মা নির্দিষ্ট বয়সের পরেও সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পেরেছেন। এখানে আদালত একটি মূলনীতি অনুসরণ করে: “The Welfare of the Child” বা সন্তানের সর্বোচ্চ কল্যাণ। যদি আদালত মনে করে মা বা বাবার কাছে থাকলে সন্তানের শারীরিক বা মানসিক উন্নতি বেশি হবে, তবে আদালত প্রচলিত বয়সের সীমা শিথিল করে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ এর ১৭/২৫ ধারা

এই আইনে আদালতে যখন কোনো সন্তানের হেফাজত নিয়ে মামলা হয়, তখন এই আইনের ১৭ ধারা এবং ২৫ ধারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ!
১৭ ধারায় কি আছে?
এই ধারা অনুযায়ী আদালত যখন কোনো অভিভাবক নিয়োগ করেন, তখন আইনের চেয়ে ‘সন্তানের কল্যাণ’ কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ ৭ বছর পার হলেও যদি দেখা যায় মায়ের কাছে থাকা টা বাচ্চার জন্য বেশি নিরাপদ। তাহলে আদালত মাকেই হেফাজত দিতে পারেন।

অন্য পোস্ট – নামজারি না করে কি ওয়ারিশি জমি বন্টননামা করা যায় কি? আইনি সমাধান জানুন

২৫ ধারায় কি আছে?
যদি সন্তান কে তার বৈধ হেফাজতকারী (যেমন মা / বাবা) কাছে থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে এই ধারার অধীনে সন্তান কে ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

মা কখন সন্তানের হেফাজত হারান?

আদালতে কাজ করার সময় দেখেছি, কিছু বিশেষ কারণে মা তার হেফাজতের অধিকার হারাতে পারেন –
★ মা পুনরায় বিয়ে করলেঃ মা যদি এমন কাউকে বিয়ে করেন যিনি সন্তানের রক্তের সম্পর্কের কেউ নয় (যেমন: সন্তানের চাচা বা মামা বাদে অন্য কেউ), তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।
★ অশোভন জীবনযাপনঃ মায়ের চরিত্র বা জীবনযাপন যদি সন্তানের নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর হয়। তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।
★ সন্তানের অবহেলাঃ মা যদি সন্তানের যত্ন নিতে ব্যর্থ হয় বা সন্তান কে অযত্নে রাখে। তাহলে তিনি সন্তানের হেফাজত হারাতে পারেন।

বাবার অধিকার ও দায়িত্ব

সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও বাবা তার প্রাকৃতিক অভিভাবক হিসেবে বহাল থাকেন। একজন বাবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব ও অধিকার হলো – সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও সন্তানের পড়ালেখা, খাবার ও চিকিৎসার খরচ (ভরণপোষণ) বাবাকেই দিতে হবে। এরপর সন্তানের সাথে বাবার দেখা করার অধিকার (Visitation Right), মা কোনো ভাবেই সন্তানের সাথে বাবার দেখা করতে বাধা দিতে পারবে না। সাধারণত আদালত বাবা ও সন্তানের দেখা করার সময় ও স্থান নির্ধারণ করে দেন।

আইনি জটিলতা এড়াতে আপনার করণীয়

যদি পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়, তবে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে দ্রুত ‘গার্ডিয়ান পিটিশন’ দায়ের করা উচিত। বিচারক মহোদয় সবসময় বাচ্চার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই রায় দেন।

একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ

আমার আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি সকল বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দেই –
ডিভোর্স আপনাদের মধ্যে হয়েছে বরং সন্তানের সাথে নয়। অর্থাৎ সন্তানের আপনাদের সম্পর্কের সাথে তুলনা করে সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবেন না। অর্থাৎ আপনাদের সন্তানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
★ পারিবারিক আইনের লড়াই দীর্ঘ মেয়াদী হয়। যদি সম্ভব হয়, উভয় পক্ষ বসে বা আইনজীবীর সহযোগিতায় সমাধানে আসলে, সন্তানের উপর এর প্রভাব পড়ে না। এজন্য আপস-মীমাংসায় সমাধান করুন।

অন্য পোস্ট – পারিবারিক আপীল ও শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের সার্টিফাইড কপি এখন কোথায় পাবেন? জেনে নিন।

এই প্রতিবেদন টি শেয়ার করে সকল কে জানার সুযোগ করে দিন এবং আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন।

Spread the love