মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং সম্ভব কি?

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং সম্ভব কি?

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি আয় করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে আপনার মনে প্রশ্ন থাকতে পারে মোবাইল দিয়ে কি ফ্রিল্যান্সিং করা সম্ভব ? উত্তরে আমি বলবো -হ্যাঁ সম্ভব! তবে আপনার সঠিক জ্ঞান, স্কিল, ধৈর্য, অ্যাপ এবং কৌশল জানা থাকতে হবে বা শিখতে হবে। এই বিজ্ঞাপনে আমরা জানবো – মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার বাস্তব চিত্র এবং কোন কাজগুলো মোবাইল দিয়ে করা যায়। কীভাবে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করবেন। মোবাইল দিয়ে আয় করা কতটা বাস্তব। এবং এই মোবাইল দিয়ে কাজ করতে কী কী সমস্যা হতে পারে। তবে আমাদের জানা দরকার এই ফ্রিল্যান্সিং কি?

ফ্রিল্যান্সিং কি?

ফ্রিল্যান্সিং এমন একটি পেশা যেখানে আপনি বিশ্বের কোনো কোম্পানিতে স্থায়ী চাকরি না করেও স্বাধীন ভাবে যেকোনো জায়গায় থেকে বা ঘরে বসে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের কাজ করে আয় করতে পারবেন। অর্থাৎ অনলাইনের মাধ্যমে অন্যের কাজ করার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা কে ফ্রিল্যান্সিং বোঝানো হয়। সাধারণত অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা সরাসরি ক্লায়েন্ট এর সাথে কথা বলে কাজ নিতে পারবেন।

ইতিপূর্বে ফ্রিল্যান্সিং নামের সাথে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার বাধ্যতামূলক ছিলো। কিন্তু বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের শক্তিশালী হার্ডওয়্যার, 4G/5G ইন্টারনেট স্পিড এবং অ্যাপ সুবিধার কারণে মোবাইল ফোন দিয়েও ফ্রিল্যান্সিং কাজ করা সম্ভব হয়।

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং কি সত্যিই সম্ভব?

হ্যাঁ, মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং সম্ভব। তবে মোবাইল ফোন দিয়ে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং কাজ করা সম্ভব হয় না। তবে নির্দিষ্ট কিছু কাজ যেগুলো মোবাইল দিয়ে করা যায়। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য বা যা নতুন ফ্রিল্যান্সিং শিখতে চাচ্ছেন তাদের জন্য মোবাইল দিয়ে এই কাজ গুলো করা সম্ভব। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী, গৃহিণী এবং চাকরিজীবী ও অন্যান্য পেশার মানুষ যারা কেবল স্মার্টফোন দিয়ে নিয়মিত ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করছে। তবে গ্রামাঞ্চলে মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং ব্যপকভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

অন্য পোস্ট – বাংলাদেশে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ করার শাস্তি

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার সুবিধা

১. কম খরচে শুরু করা যায়

যেখানে ল্যাপটপ কিনতে ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়।সেখানে আপনার হাতে থাকা মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে পারছেন। অতিরিক্ত কোনো বড় খরচ ছাড়াই কাজ শুরু করতে পারছেন।

২. যেকোনো জায়গা থেকে কাজ করা যায়

আপনি বাসে৷ বা ট্রেনে বা বাড়িতে বা অফিসে কাজের ফাঁকে যে কোনো জায়গা থেকে আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন দিয়ে কাজ করতে পারছেন।

৩. নতুনদের জন্য সহজ

নতুনদের জন্য খুব সহজ স্মার্টফোন দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করা। তবে স্মার্টফোনের র‍্যাম সর্বনিম্ন ৪ জিবি হলেও ভালো ভাবে কাজ করা যায়। তবে ৮ জিবি র‍্যাম হলে দ্রুত কাজ করা যায়।

৪. সময়ের স্বাধীনতা

কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। নিজের সুবিধা মতো কাজের ফাঁকে এই কাজগুলো করা যায়। এই জন্য ফ্রিল্যান্সিং কাজে সময়ের স্বাধীনতা রয়েছে।

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার সীমাবদ্ধতা

১. ছোট স্ক্রিনের কারনে সমস্যা হয়ে পারে

একটানা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে চোখে চাপ পড়ে। যার কারনে চোখের এবং ফেস স্কিনের সমস্যা হতে পারে।

২. সব কাজ করা যায় না

ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা বড় ভিডিও এডিটিং বা সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট সহ বড় প্রজেক্টের কাজগুলো মোবাইলে করা সম্ভব হয় না বা কিছু টা হলেও অনেক কঠিন হয়।

৩. মাল্টি ট্যাব সমস্যা

একসাথে অনেকগুলো ট্যাব বা সফটওয়্যার ব্যবহার করলে মোবাইল হ্যাং বা অকেজু হতে পারে বা স্লো কাজ করতে পারে।

মোবাইল দিয়ে কোন কোন ফ্রিল্যান্সিং কাজ করা যায়?

১. কনটেন্ট রাইটিং

স্মার্টফোন দিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্রিল্যান্সিং কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কনটেন্ট রাইটিং । কনটেন্ট রাইটিংয়ের মধ্যে রয়েছে –

  • ১.ব্লগ পোস্ট লেখা
  • ২.ফেসবুক পোস্ট
  • ৩.প্রোডাক্ট ডিসক্রিপশন লেখা
  • ৪.স্ক্রিপ্ট রাইটিং

কনটেন্ট রাইটিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপ

  • ১. Google Docs
  • ২. Microsoft Word
  • ৩. Grammarly Keyboard

২. ডাটা এন্ট্রি

এটি নতুনদের জন্য উপযোগী এবং সহজ কাজ সহজ। মূল কাজ –

  1. ১.কপি পেস্ট করা
  2. ২.ফর্ম ফিলাপ করা
  3. ৩.অনলাইন ডাটা কালেকশন করা
  4. ৩. সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট
  • ফেসবুক পেজ ম্যানেজ করা
  • কমেন্ট এবং মেসেজ রিপ্লাই করা
  • পোস্ট মেনটেন্ট করা

সোস্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের জন্য কি কি অ্যাপ প্রয়োজন

  • ১.Meta Business Suite
  • ২.Buffer
  • ৩.Hootsuite

৪. গ্রাফিক ডিজাইন – বেসিক

  • ১.পোস্টার ডিজাইন করা
  • ২.ফেসবুক ব্যানার তৈরি করা
  • ৩.থাম্বনেইল ডিজাইন করা

গ্রাফিক ডিজাইননের জন্য কি কি অ্যাপ প্রয়োজন

  • ১.Canva
    ২.Pixellab
    ৩.Adobe Express

৫. ভিডিও এডিটিং – বেসিক

  • ১.শর্ট ভিডিও বানানো
    ২.রিলস / TikTok ভিডিও বানানো
    ৩.ইউটিউব শর্টস ভিডিও বানানো

ভিডিও এডিটিংয়ের জন্য অ্যাপ প্রয়োজন

  • ১.CapCut
    ২.InShot
    ৩.VN Video Editor

৬. অনুবাদ

আপনি যদি বাংলা ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে থাকেন। তাহলে আপনি এই কাজ করতে পারেন। এই কাজে নির্দিষ্ট ভাষার কনটেন্ট অনুবাদ করতে হয়।

৭. AI টুল ব্যবহার করে কাজ করা

  • ১. ChatGPT দিয়ে কনটেন্ট আইডিয়া তৈরি করা
    ২.AI দিয়ে ছবি তৈরি করা
    ৩.স্ক্রিপ্ট তৈরি করা

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করার ধাপ সমুহঃ-

প্রথম ধাপ : আপনাকে একটি নির্দিষ্ট স্কিল বেছে নিতে হবে।

এক সাথে অনেক গুলো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিবেন না। বরং একটি স্কিল নিয়ে কাজ করুন।

দ্বিতীয় ধাপ : প্রয়োজনীয় অ্যাপ ইনস্টল করুন

আপনার কি নিয়ে কাজ করবেন তার উপর নির্ভর করবে কি কি অ্যাপ লাগবে।

দ্বিতীয় ধাপ : মার্কেটপ্লেস একাউন্ট খুলুন

১.Fiverr
২.Upwork
৩.Freelancer

৪র্থ ধাপ : প্রোফাইল প্রফেশনাল ভাবে সাজান

১.পরিষ্কার ছবি
২.স্পষ্ট বর্ণনা
৩.স্কিল হাইলাইট

পঞ্চম ধাপ : ছোট কাজ দিয়ে শুরু করুন

প্রথম অবস্থায় কম দাম কাজগুলো টার্গেট করে রিভিউ সংগ্রহ করুন। এরপর বড় কাজ করুন।

অন্য পোস্ট – বাংলাদেশের লাভজনক ১০ টি ব্যবসা

মোবাইল দিয়ে ইনকাম করা কতটা বাস্তব?

প্রথম অবস্থায় মাসে ৫,০০০৳ থেকে ১০,০০০৳ টাকা আয় করা সম্ভব হতে পারে। আপনার অভিজ্ঞতা হলে ৩০,০০০৳ থেকে ৫০,০০০৳ টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। তবে আপনার আগ্রহ, চেষ্টা, ধৈর্যের উপ নির্ভর করে আপনার ইনকাম কেমন হবে।

স্ক্যাম থেকে বাঁচার উপায়

১.অগ্রিম টাকা দিবেন না।
২.মার্কেটপ্লেসের বাইরে ডিল করবেন না।
৩.ভেরিফাইড ক্লায়েন্ট খুজে নিন।

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা কাদের জন্য উপযোগী?

১.শিক্ষার্থী
২.গৃহিণী
৩.পার্টটাইম কাজ করে আয় করতে ইচ্ছুক।
৪.গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা।

ভবিষ্যতে কি মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা আরও জনপ্রিয় হবে?

বর্তমানে 5G চালু হওয়ায় AI ও অ্যাপ এর উন্নয়নের কারণে শতভাগ নিশ্চিত ভাবে বলা ভবিষ্যতে মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা আরও উন্নত হবে। দিন দিন মোবাইল দিয়ে কাজের সুযোগ আরও বাড়বে।

মোবাইল ফ্রিল্যান্সিংয়ে সাধারণ ভুল

১.একসাথে অনেকগুলো স্কিল শেখা – নির্দিষ্ট একটি স্কিলে উপর ফোকাস না করলে কখনো কাজ শেখা যায় না।

২. স্ক্যাম সাইটে কাজ খোঁজা – সব ধরনের কাজের সাইট বিশ্বাস-যোগ্য নয় বা কাজ দেয় না, অগ্রিম পেমেন্ট নিয়ে থাকে। এই সব থেকে সাবধান থাকতে হবে।

৩. ধৈর্য হারানো – প্রথম মাসে ইনকাম না হলে অনেকেই কাজ ছেড়ে দেয়। এজন্য ধৈর্য ধরে কাজ করতে হবে।

মোবাইল থেকে আয় বাড়ানোর অ্যাডভান্স পরামর্শ

১.একই স্কিলে মধ্যে ২/৩ ধরনের সার্ভিস দিন।
২.নিয়মিত মার্কেটপ্লেস দেখুন।
৩.ক্লায়েন্টদের সাথে প্রফেশনাল ভাবে কথা বলুন।
৪.কাজের নিয়ম মেনে চলুন।

মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য পড়াশোনা/চাকরি ম্যানেজ করবেন, যেভাবে-

১.নির্দিষ্ট সময় বেছে নিতে হবে।
২.দৈনিক টাস্ক লিস্ট বানাতে হবে।
৩.সপ্তাহে এক দিন বিশ্রাম নিতে পারেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কখন ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নিবেন?

যখন আপনি কাজে দক্ষ হবে এবং নিয়মিত ইনকাম করতে পারবেন বা কাজের চাপ বেড়ে যাবে, তখন ল্যাপটপ বা কম্পিউটার নেওয়া/ব্যবহার করে কাজ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে শুরুতে মোবাইল দিয়ে শেখা এবং ইনকাম শুরু করা সবচেয়ে স্মার্ট সিদ্ধান্ত হবে।

শেষ কথা ও মতামত

যদি আপনার কাছে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ থাকে এবং শেখার আগ্রহ থাকে। তাহলে আজই মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করুন। আপনার একটি আগ্রহ আপনার সফলতার দরজা খুলে দিতে পারে।

Spread the love

Leave a Comment