স্টক মার্কেট ব্যবসা নতুনরা কিভাবে করবেন
স্টক মার্কেট কি?
স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজার একটি আর্থিক বাজার। যেখানে কোম্পানির শেয়ার ক্রয় বিক্রয় করা হয়। এই স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজার কোম্পানি গুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহের একটি প্রধান উৎস বলা যায়।
এই শেয়ার বাজারের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির মালিকানার অংশ কিনে আয় করে থাকে। শেয়ার বাজার কেবল মাত্র অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেয় না। বরং এটি বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা, অর্থনীতি এবং বাজারের অবস্থা বোঝার জন্য কাজ করে ।
স্টক মার্কেটের ইতিহাস
ইউরোপে ১৬শ শতকে স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজার এর উৎপত্তি হয় । Amsterdam Stock Exchange প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে । এরপরই স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারের সূচনা হয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এর মাধ্যমে। প্রথমদিকে কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হতো। বর্তমান সময়ে স্টক মার্কেট বা শেয়ার বাজারে হাজার হাজার কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়।
স্টক মার্কেটের প্রধান উপাদান
স্টক মার্কেটের মূল উপাদানগুলো হলো:
১. কোম্পানি – যারা শেয়ার ইস্যু করে মূলধন সংগ্রহ করে।
২. বিনিয়োগকারী – যারা শেয়ার কিনে এবং বিক্রি করে লাভ করার চেষ্টা করে।
৩. ব্রোকার – বিনিয়োগকারীর হিসেবে লেনদেন পরিচালনা করে।
৪. স্টক এক্সচেঞ্জ – যেখানে সমস্ত লেনদেন হয়।
৫. নিয়ন্ত্রক সংস্থা – বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং তদারকি করে।
শেয়ার কী?
শেয়ার হলো কোনো কোম্পানি/প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ। শেয়ার কিনলে আপনি সেই কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের আংশিক মালিক হয়ে যান।
এই শেয়ারের মাধ্যমেই কোম্পানি তার মূলধন সংগ্রহ করে থাকে। বিনিয়োগকারী শেয়ারের মূল্যের ওঠা-নামা এবং লভ্যাংশ থেকে লাভ পেয়ে থাকে।
শেয়ারের প্রধান ধরন
কমন শেয়ারঃ সাধারণ শেয়ার, ভোটাধিকার এবং লভ্যাংশ পাওয়া যায়।
প্রেফারেন্স শেয়ারঃ বিশেষ সুবিধা এবং লভ্যাংশ থাকে ও ভোটাধিকার কম থাকে।
শেয়ার ক্রয় ও বিক্রয় করার প্রক্রিয়া
শেয়ার ক্রয় করার প্রক্রিয়া
১. DSE বা CSE ব্রোকারের মাধ্যমে ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলুন ।
২. আপনার হয়ে লেনদেন করার জন্য ব্রোকার নির্বাচন করুন।
৩.শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয় করার জন্য অর্ডার দিন।
৪. লেনদেন সম্পন্ন শেয়ার ক্রয় বা বিক্রয় হলে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে তা দেখা যায়।
বিভিন্ন ধরনের স্টক মার্কেট
স্টক মার্কেট কে মূলত দুই ভাগে ভাগ হয়ে থাকেঃ-
১. প্রাইমারি মার্কেটঃ
প্রাইমারি মার্কেটে কোম্পানিগুলো নতুন শেয়ার ইস্যু করে।
উদাহরণ: Initial Public Offering যাহা সংক্ষেপে IPO বলে।
২. সেকেন্ডারি মার্কেটঃ
সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগকারী সকলে একে অপরের সাথে শেয়ার লেনদেন করে থাকে।
উদাহরণ: DSE এবং CSE।
বিনিয়োগ এবং ট্রেডিং-এর মধ্যে পার্থক্য
বিনিয়োগ
বিনিয়োগ হলো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এবং কম ঝুঁকি ও মূলধন বৃদ্ধি একটি মাধ্যম । বিনিয়োগের মাধ্যমে সাধারণত মাস বা বছরের জন্য শেয়ার রাখা হয়ে থাকে ।
ট্রেডিং
স্বল্পমেয়াদি এবং বেশি ঝুঁকি ও লভ্যাংশের চেয়ে মূল্যের ওঠা-নামা থেকে লাভ করে থাকে।
ঝুঁকি এবং রিস্ক ম্যানেজমেন্ট
স্টক মার্কেট ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে ঝুঁকি কমানোর কিছু উপায় ও আছে। যথাঃ-
১. বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
২. বাজার গবেষণা করতে হবে।
৩. স্টক মার্কেট নিউজ নিয়মিত দেখতে হবে।
৪. দীর্ঘ মেয়াদী এবং স্বল্প মেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
৫. অনিয়মিত লেনদেন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
স্টক মার্কেটে কিভাবে সফল হবেন
সফল বিনিয়োগের জন্য:
- শেয়ার বাজারে ধৈর্য ধরুন
- কারিগরি এবং মৌলিক বিশ্লেষণ করা শিখুন
- শেয়ার বাজারের ইতিহাস ও কোম্পানির মৌলিক বিশ্লেষণ করে দেখুন
- শেয়ার বাজারের নিয়মিত নিউজ এবং রিপোর্ট গুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
- প্রফেশনাল মাধ্যম গুলো ব্যবহার করুন
নতুনদের যে সব ভুল করা উচিত নয়
১. ঝুঁকি না নিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে।
২. কোনো কোম্পানির শেয়ারে এক বারে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে না।
৩. শেয়ার বাজারে দামের ওঠা-নামা দেখে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। বরং ধৈর্য ধরতে হবে।
৪. লভ্যাংশ ছাড়া অন্য বিষয় না দেখে কাজ করতে হবে।
৫. নিজের রিসার্চ না করে, অন্যের পরামর্শে চলা যাবে না। বরং নিজে যাচাই করতে হবে।
মূলধন বাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নিয়ম
বাংলাদেশে BSEC (Bangladesh Securities and Exchange Commission) বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ।
BSEC এর প্রধান কাজঃ
১.কোম্পানি গুলোর নিয়মিত রিপোর্ট তদারকি করে থাকে।
২.নতুন শেয়ারের IPO অনুমোদন করা
৩.বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে থাকে।
৪.বাজারে অনিয়ম প্রতিরোধ করে থাকে।
জনপ্রিয় স্টক মার্কেট পরিভাষা
১. IPO: Initial Public Offering যাহা প্রথম বারের মতো শেয়ার ইস্যু করা বোঝানো হয়।
২. Dividend: কোম্পানির গুলোর মুনাফার অংশ যাহা শেয়ার হোল্ডার কে প্রদান করা বোঝানো হয়।
৩. Bull Market: বাজার উর্ধ্বমুখী কে বোঝানো হয়।
৪. Bear Market: বাজার নিম্নমুখী কে বোঝানো হয়।
৫. Broker: শেয়ার লেনদেনের এজেন্ট কে বোঝানো হয়।
৬. Market Capitalization: কোম্পানি গুলোর বাজার মূলধন কে বোঝানো হয়।
৭. Volume: লেনদেন হওয়া শেয়ার এর পরিমাণ কে বোঝানো হয়।
অনলাইন স্টক মার্কেট ট্রেডিং
বর্তমানে সময়ে অনলাইনে ট্রেডিং সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
অনলাইন স্টক মার্কেট ট্রেডিংয়ের সুবিধাঃ
১.দ্রুত লেনদেন করা যায়।
২.যে কোনো সময় বাজার ফলো করা যায়।
৩.কমিশন খরচ কম
৪.সহজে অ্যাক্সেস পাওয়া যায়
৫.বিভিন্ন ট্রেডিং মাধ্যম ব্যবহার করা যায়
অনলাইন স্টক মার্কেট ট্রেডিংয়ের নিয়মঃ
১. বিশ্বাস যোগ্য ব্রোকারের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা
২. অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লগইন করা
৩. অর্ডার দেওয়া এবং ট্রেড সম্পন্ন করা
বিনিয়োগের জন্য পরামর্শ
১. দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করুন।
২. বাজার সব সময় বিশ্লেষণ করুন।
৩. বিভিন্ন ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করুন।
৪. কারিগরি এবং মৌলিক বিশ্লেষণ করা শিখুন।
৫. হঠাৎ করে লোভে পড়ে বা আতঙ্কের মাঝে লেনদেন করবেন না।
৬. শেয়ার খুঁজে বের করার জন্য নিউজ রিপোর্ট দেখুন এবং পেশাদার ব্যাক্তির নিকট পরামর্শ নিন।
৭. সব সময় নিজের স্টক মার্কেট ব্যবসা শেখা বৃদ্ধি করেন।
মতামত
স্টক মার্কেট হলো উচ্চ লাভের বিনিয়োগ ক্ষেত্র। যেখানে প্রচুর ধৈর্য, জ্ঞান এবং কৌশল থাকতে হবে, তাহলে ভালো লাভ করা সম্ভব হবে ।
নতুনদের জন্য যা যা করা উচিতঃ
১.প্রথমে ছোট অঙ্কে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।
২.শেয়ার বাজার নিয়ে গবেষণা করা এবং বাজার পর্যালোচনা করতে হবে।
৩.ঝুঁকি সামলাতে শিখতে হবে।
৪.পেশাদার ব্যাক্তির নিকট থেকে পরামর্শ নিতে হবে।
ধৈর্য ধরে সঠিক জ্ঞান এবং নিয়মিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্টক মার্কেটকে ধরে রাখতে পারলে খুব অল্প সময়েই সফল হতে পারবেন।

2 thoughts on “স্টক মার্কেট ব্যবসা নতুনরা কিভাবে করবেন”