দণ্ডবিধি ৪০৬ ও ৪২০ ধারা | নওগাঁ আদালতের রায় ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ
নওগাঁ জজ কোর্টে কাজের অভিজ্ঞতায় আমি প্রায়ই দেখি, পারিবারিক বিশ্বাস বা মৌখিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বড় অংকের লেনদেন হয়। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে শুধুমাত্র “বিশ্বাস” যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অকাট্য প্রমাণ। আপনার দেওয়া এই মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বেরিয়ে আসে। তেমনি একটি মামলার ঘটনা বর্ণনা প্রতিবেদন আকারে সাজিয়েছি। এই প্রতিবেদনে ব্যক্তির নাম, মাম নম্বর নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয় নাই, শুধু মাত্র বাস্তব উদাহরণ ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। যার মাধ্যমে সচেতনতা বাড়বে। এই প্রতিবেন টি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, আপনার এক একটি অভিজ্ঞতা বাড়বে।
মামলার মূল বিষয় কি ছিলো?
বিদেশে থাকাকালীন একজন ব্যক্তি তার আপন ভাইকে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ধাপে ধাপে অনেক পরিমাণ টাকা পাঠিয়েছেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে সেই টাকা ফেরত চাইলে ভাই তা দিতে অস্বীকার করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) এবং ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় মামলাটি নওগাঁর আদালতে দায়ের করা হয়েছিলো।
আদালত কেন আসামিকে খালাস দিলেন?
মামলার জাবেদা নকল রায়ের কপিটি ১০ই জানুয়ারি ২০২৬-এ ঘোষিত যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদালত প্রধানত তিনটি কারণে আসামিকে খালাস দিয়েছেন –
★ টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্য অস্পষ্ট:
মামলার নথিতে টাকা পাঠানোর স্লিপ থাকলেও, সেই টাকা ঠিক কী কারণে (যেমন: সম্পদ কেনা/ ব্যবসা/আমানত রাখা ইত্যাদি) পাঠানো হয়েছিলো, তার কোনো লিখিত চুক্তি বা স্পষ্ট প্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত করতে পারেন নি।
★ সাক্ষ্য ও আরজির অসামঞ্জস্য:
বাদীর আরজিতে এবং সাক্ষীদের জবানবন্দিতে ঘটনার সময় ও স্থান নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা ছিলো। বিশেষ করে, অভিযুক্ত কেন টাকাগুলো নিলেন বা কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা সাক্ষীরা জোরালোভাবে প্রমাণ করতে পারেন নি।
★ পারিবারিক লেনদেনের জটিলতা:
আদালত মনে করেছেন, যেহেতু এটি আপন দুই ভাইয়ের মধ্যের বিষয় এবং কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি দলিল নেই, তাই এটি একটি দেওয়ানি প্রকৃতির (Civil nature) বিরোধ হতে পারে, যা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়নি।
আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমার পরামর্শ
যারা প্রবাসে থাকেন বা প্রিয়জনদের টাকা পাঠান, তাদের জন্য এই মামলার রায় থেকে বড় কিছু শেখার আছে।
অন্য পোস্ট – ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চেক ডিজঅনার মামলার বিচার এখন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে
★ লিখিত দলিল বাধ্যতামূলক কেনো?
যত আপন মানুষই হোক না কেন, বড় অংকের লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি টাকা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র বা চুক্তিপত্র (কমপক্ষে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে) করে লিখিত রাখা উচিত। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে টাকাটি কেন দেওয়া হচ্ছে এবং কবে ফেরত পাওয়া যাবে। নির্দিষ্ট কারন ও বর্ণনা জরুরি।
★ ব্যাংকিং চ্যানেলের ব্যবহার:
টাকা সবসময় ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠানো নিরাপদ। যদিও এই মামলায় টাকা পাঠানোর স্লিপ ছিল। কিন্তু সেই টাকা “আমানত” হিসেবে দেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রমাণ করা জরুরি ছিলো।
★ ফৌজদারি বনাম দেওয়ানি মামলা:
টাকা উদ্ধারের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতারণার (৪২০ ধারা) মামলা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে, যদি প্রাথমিক চুক্তি না থাকে। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ‘মানি স্যুট’ (Money Suit) বা অর্থ আদায়ের দেওয়ানি মামলা করলে টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
★ সাক্ষীদের প্রস্তুতি:
আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ঘটনার তারিখ, সময় এবং আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সব সাক্ষীর বক্তব্য সাথে মিল হওয়া প্রয়োজন। বক্তব্যের ভিন্নতা আসামিকে খলাস পাইতে সুবিধা দেয়। ঠিক তেমনি একটি মামলায় আসামি খালাস পেয়ে গেলেন। কিন্তু এখন করণীয় কি? সে বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেছি।
নিম্ন আদালতের খালাস রায়ের বিরুদ্ধে করণীয় (আপিল ও রিভিশন)
এই মামলায় যেহেতু আসামিকে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তাই বাদী চাইলে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে যেতে পারবেন। উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রধান দুটি দিক হলো –
জেলা জজ আদালতে আপিল
ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের খালাস রায়ের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল দায়ের করা যায়।
★ সময়সীমা:
সাধারণত রায় হওয়ার দিন থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৩০-৬০ দিন) এই আপিল করতে হয়।
★ যুক্তি:
আপিলে বাদীর আইনজীবীকে প্রমাণ করতে হবে যে, ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণে ভুল করেছেন এবং টাকা পাঠানোর যে তথ্য-প্রমাণ (স্লিপ) দেওয়া হয়েছে তা আমলযোগ্য ছিলো। এবং সঠিকভাবে বিশ্লেষণ বা পর্যালোচনা না করেই আদেশ দেওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতে রিভিশন
যদি আপিলের সুযোগ কোনো কারণে সীমিত হয়, তাহলে আইনগত ভুল বা নথিপত্র পর্যালোচনায় বড় কোনো ত্রুটি থাকে, তাহলে হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন মামলা করা যেতে পারে। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে প্রথমে জেলা জজ আদালতেই আপিল করা ভালো। আমি, ধাপে ধাপে উচ্চ আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দিই।
পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের জন্য আমার পরামর্শ
যদি বাদী পক্ষ পুনরায় আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চায়, তাহলে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি বলে মনে করি।
★ নতুন করে নথিপত্র সাজানো:
ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, টাকা পাঠানোর উদ্দেশ্য (যেমন: জমি কেনা বা আমানত রাখা) স্পষ্ট ছিলো না। আপিলে এই জায়গাটি জোরালো করতে হবে। টাকা পাঠানোর সময় কোনো চিঠি বা মৌখিক আলাপ যে হয়েছিল, তার আরও নির্ভরযোগ্য এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলো /দেখেছে এমন সাক্ষী হাজির করতে হবে।
★ দেওয়ানি মামলা (Money Suit) করা:
ফৌজদারি মামলায় আসামির জেল হতে পারে, কিন্তু টাকা উদ্ধারের নিশ্চয়তা সব সময় থাকে না। টাকা উদ্ধারের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো ‘মানি স্যুট’ বা অর্থ আদায়ের দেওয়ানি মামলা করা। যেহেতু টাকা পাঠানোর ব্যাংক স্লিপ বা প্রমাণাদি আছে, তাই দেওয়ানি আদালতে এই টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে ।
অন্য পোস্ট – জমির ভুয়া দলিল বাতিল ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন
★ আপোষ-মীমাংসা (ADR):
অনেক সময় মামলা দীর্ঘায়িত না করে স্থানীয় ভাবে বা আদালতের মাধ্যমে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (ADR) পদ্ধতিতে বড় ভাই ও ছোট ভাইয়ের মধ্যে টাকা ফেরতের বিষয়ে একটি সমঝোতা করা যেতে পারে।
আপিল করার প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
নিম্ন আদালতের রায়ে যদি বাদী সন্তুষ্ট না হয়, তাহলে ভয় না পেয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পথ খোলা আছে। এই আইনী লড়াইয়ের জন্য আপনাকে যা যা করতে হবে।
আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র
আপিল করার জন্য সবার আগে আপনার হাতে থাকা জাবেদা নকল (Certified Copy) বা মূল রায়ের কপিটি লাগবে। এরপর পরবর্তী কাজ হলো –
★ মামলার মূল আরজির কপি।
★ সাক্ষীদের জবানবন্দির সার্টিফাইড কপি।
★ টাকা পাঠানোর যে সকল স্লিপ বা রসিদ আপনি আদালতে জমা দিয়েছিলেন, সেগুলোর সত্যায়িত ফটোকপি সেট।
অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ
আপিল ফাইল করার জন্য জেলা জজ আদালতের একজন অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীকে দায়িত্ব দিতে হবে। তিনি আপনার হয়ে আপিল মেমো তৈরি করবেন, যেখানে উল্লেখ থাকবে নিম্ন আদালতের রায় টি কেন/কি কি ভুল ছিলো।
অপিল মামলার খরচের ধারণা
আদালতের খরচ মূলত মামলার ধরণ এবং আইনজীবীর ফি’র উপর নির্ভর করে। তবে সাধারণ ধারণা হিসেবে বলা যায়:
★ কোর্ট ফি (Court Fees):
আপিল দায়ের করার সময় নির্দিষ্ট মূল্যের কোর্ট ফি বা স্ট্যাম্প ফি দিতে হয়। এটি সাধারণত খুব বেশি বড় অংকের হয় না।
★ আইনজীবীর ফি:
এটি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনি কতজন আইনজীবী নিয়োগ করছেন বা তিনি কত অভিজ্ঞ তার উপর। তবে খরচের বিষয় টি পরিচিতি/সম্পর্ক/স্থানের উপর নির্ভর করে।
★ টাইপিং ও প্রসেস ফি: আপিল মেমো তৈরি, টাইপিং এবং আদালতের প্রসেস সার্ভারের মাধ্যমে আসামিকে নোটিশ পাঠানোর জন্য কিছু আনুষঙ্গিক খরচ আছে। এজন্য নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।
অন্য পোস্ট – কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? নিয়ম ও কাগজপত্র
আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ ও মতামত
আপনি যখন আপিল করবেন, তখন এই বিষয়গুলো আপনার আইনজীবী সাহেবকে বিশেষভাবে বলতে পারেন:
★ বিদেশের কষ্টার্জিত টাকা: বাদী যে প্রবাসে থেকে হাড়ভাঙা খাটুনি করে টাকা পাঠিয়েছেন, সেই আবেগীয় এবং মানবিক দিকটি আদালতে জোরালোভাবে তুলে ধরা।
★ সাক্ষীদের ভূমিকা: আপিলে নতুন করে সাক্ষী দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, তবে আগের সাক্ষীদের বক্তব্য কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তা বিশ্লেষণ করতে হবে।
★ সমান্তরাল দেওয়ানি মামলা: আপনি যদি শুধু আসামির শাস্তি নয়, বরং আপনার টাকা ফেরত পেতে চান, তবে ফৌজদারি আপিলের পাশাপাশি একটি ‘মানি স্যুট’ (Money Suit) করার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবুন। কারণ দেওয়ানি আদালত টাকার প্রমাণ (রসিদ) থাকলে সাধারণত ডিক্রি দিয়ে থাকে।
রায়ের তারিখ থেকে আপিল করার জন্য ৩০ থেকে ৬০ দিনের একটি আইনি সীমাবদ্ধতা (Limitation) থাকে। তাই সময় শেষ হওয়ার আগেই জাবেদা নকল নিয়ে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আইনের চোখে শুধু টাকা পাঠানোই যথেষ্ট নয়, কেন পাঠিয়েছেন এবং সেটি যে আত্মসাৎ করা হয়েছে তা কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
নওগাঁর মাটিতে আমরা অনেক বিচারপ্রার্থীকে দেখেছি যারা ধৈর্য ধরে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পেয়েছেন। আপনি যদি একই সমস্যার পড়েন তাহলে ঠিক একইভাবে সঠিক পথে এগোলে ইনশাআল্লাহ ভালো ফল পাবেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমি নওগাঁ জজ কোর্টে একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে কর্মরত। এই লেখাটি সম্পূর্ণভাবে আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে পাঠকদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে লেখা। সুনির্দিষ্ট আইনি প্রতিকারের জন্য সবসময় একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Mithu Babu 


















