এক জমি দুই জনের নামে খারিজ হলে কি করবেন?
নওগাঁ জজ কোর্টের একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, জমির মালিকানা নিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েন তা হলো— একই জমি দুই জনের নামে খারিজ বা নামজারি হয়ে যাওয়া।
আপনার কষ্টের টাকায় কেনা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিটি যখন অন্য কারো নামেও রেকর্ড হয়ে যায়, তখন দুশ্চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক আইনি পথ জানলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। আজ আমার পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে এই জটিলতা থেকে মুক্তির উপায়গুলো সহজভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
১. প্রথমেই বুঝে নিন: খারিজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সহজ কথায়, সরকারি খাতায় (ভূমি অফিসে) পূর্বের মালিকের নাম কেটে আপনার নাম তোলাকেই খারিজ বা নামজারি বলে। এটি কেন করবেন?
★ জমির খাজনা বা কর দেওয়ার জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
★ জমি বিক্রি বা ব্যাংকে বন্ধক রাখতে গেলে খারিজ খতিয়ান ছাড়া সম্ভব নয়।
★ মনে রাখবেন: খারিজ থাকলেই আপনি চূড়ান্ত মালিক নন, তবে এটি মালিকানার একটি বড় প্রশাসনিক স্বীকৃতি।
২. একই জমি কেন দুই জনের নামে খারিজ হয়?
আমার দেখা মতে, সাধারণত নিচের কারণগুলোতে এই জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যায়:
★ জাল দলিল: কেউ ভুয়া দলিল তৈরি করে গোপনে খারিজ করে নিলে।
★ বণ্টননামা না থাকা: ওয়ারিশরা আপস-বণ্টন না করেই আলাদাভাবে নিজ নিজ নামে খারিজ করলে।
★ তথ্য গোপন: আগের বিক্রির তথ্য লুকিয়ে নতুন করে আবার খারিজের আবেদন করলে।
★ অফিসের ভুল: ভূমি অফিসের নথিপত্র যাচাইয়ে অসতর্কতা বা সার্ভে রেকর্ডে ভুল থাকলে।
৩. এই সমস্যা হলে আপনার করণীয় (পরামর্শ)
যদি দেখেন আপনার জমিতে অন্য কারো নামেও খারিজ আছে, তবে বসে না থেকে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নিন:
১: তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ
সবার আগে ঠান্ডা মাথায় নথিপত্র জোগাড় করুন। আপনার মূল দলিল, আগের বায়া দলিল, পর্চা এবং অপর পক্ষের ওই ভুয়া খারিজের সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করুন। নওগাঁ বা আপনার নিকটস্থ ভূমি অফিস থেকে এগুলো সংগ্রহ করা যাবে।
২: এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিসে আবেদন
যদি ভুলটি সাম্প্রতিক হয় বা প্রশাসনিক ত্রুটি থাকে, তবে আপনি সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিসে (এসি ল্যান্ড) ‘মিস কেস’ (Miscellaneous Case) বা বিবিধ মামলা দায়ের করতে পারেন।
অন্য পোস্ট – কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? নিয়ম ও কাগজপত্র
★ এখানে শুনানির মাধ্যমে এসি ল্যান্ড মহোদয় উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই করবেন।
★ যদি প্রমাণিত হয় অপর পক্ষের খারিজটি অবৈধ, তবে তিনি তা বাতিলের আদেশ দিতে পারেন।
৩: দেওয়ানি আদালতে মামলা (যদি ভূমি অফিসে সমাধান না হয়)
অনেক সময় ভূমি অফিস জটিলতা নিরসন করতে পারে না। সেক্ষেত্রে আপনাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শে আপনি নিচের মামলাগুলো করতে পারেন:
★ ঘোষণামূলক মামলা (Declaratory Suit): আদালত থেকে আপনার মালিকানা বৈধ বলে ঘোষণা নেওয়া।
★ দলিল বা রেকর্ড বাতিলের মামলা: অবৈধ খারিজ বা দলিলটি বাতিলের জন্য আবেদন করা।
★ স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা: যাতে অন্য পক্ষ আপনার জমির দখল নিতে না পারে বা জমিটি হস্তান্তর করতে না পারে।
৪. সাধারণ কিছু ভুল যা এড়িয়ে চলবেন
পেশাগত জায়গা থেকে আমার পরামর্শ থাকবে এই ভুলগুলো কখনোই করবেন না:
★ শুধু খারিজ দেখে জমি কেনা: মনে রাখবেন, মূল দলিল (Title Deed) ঠিক না থাকলে শুধু খারিজ দিয়ে মালিকানা টিকে না। কেনার আগে দলিলে দলিলে মিল আছে কি না তা দেখুন।
★ মৌখিক চুক্তিতে বিশ্বাস: জমি সংক্রান্ত কোনো কথা মুখে রাখবেন না, সবকিছু লিখিত ও রেজিস্ট্রি করুন।
★ আইনি পদক্ষেপে দেরি করা: সমস্যা জানার সাথে সাথে ব্যবস্থা নিন। সময় পার হয়ে গেলে আইনি জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
৫. আমার ব্যক্তিগত মতামত ও শেষ কথা
জমি নিয়ে বিরোধ মানেই বছরের পর বছর কোর্টে দৌড়ানো—এমন ধারণা সবসময় ঠিক নয়। আপনি যদি শুরুতেই সঠিক নথিপত্র নিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসে যোগাযোগ করেন বা একজন দক্ষ আইনজীবীর মাধ্যমে সঠিক ধারায় মামলা করেন, তবে খুব দ্রুতই সমাধান পাওয়া সম্ভব।
বর্তমানে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অনলাইনেও খতিয়ান যাচাই করা যায়। তাই নিয়মিত আপনার জমির রেকর্ড চেক করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই প্রতিবেদনটি যদি আপনার উপকারে আসে, তবে পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন যাতে তারাও সচেতন হতে পারে।

Mithu Babu 
















