আদালত অবমাননার শান্তি ও পুলিশের করণীয়

আদালত অবমাননার শান্তি ও পুলিশের করণীয় 

আদালতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে পুলিশের করণীয়

সকল পুলিশ অফিসার আদালত, ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারকদের প্রতি সম্মান ও স্যালুট প্রদর্শন করিবেন। আদালতে পুলিশ অফিসার পোশাক পরিহিত থাকবেন এবং পুলিশ অফিসার সাক্ষ্য প্রদানকালে টুপি খুলে সাক্ষ্য প্রদান করিবেন [পিআরবি ৭২৮ (২১) প্রবিধি]। পুলিশ অফিসার কোনো আদালতের কোনো কার্যক্রম এর সমালোচনা করিবেন না (পিআরবি ৩০ প্রবিধি)। তবে কোথাও ন্যায় বিচার বিঘ্নিত করা হচ্ছে বা পুলিশকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে বা হয়েছে, সেই ক্ষেত্রে পুলিশ সুপার বিষয় টি চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এর নিকট জানাবেন [পিআরবি ৩০(এ) প্রবিধি]।

পুলিশ কর্তৃক কিভাবে আদালত অবমাননা হয়

আদালত অবমাননার জন্য পেনাল কোড এর ২২৮ ধারা, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারা এবং আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ ২০০৮ এর ১৩ ধারামতে ১ মাস কারাদণ্ড অথবা ২০০৳ থেকে ২০০০৳ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে।

দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারা

যদি কোনো ব্যাক্তি আইন অনুযায়ী গ্রেফতার করা হলে বা আদালতের আদেশে বা আইন অনুযায়ী হেফাজতে থাকাকালীন পালিয়ে যায়,বা পালানোর চেষ্টা করে, তাহলে সেই ব্যাক্তি দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারা মতে অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে।

অন্য পোস্ট – স্টক মার্কেট ব্যবসা নতুনরা কিভাবে করবেন

দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারার শাস্তির বিধান

যদি কোনো ব্যাক্তি এই ধারায় দোষী প্রমাণিত হয় তাহলে —

যদি সাধারণ অপরাধের কারণে আটক থাকে, তাহলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। আবার যদি আটক থাকার কারণ গুরুতর অপরাধের (যার শাস্তি যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড হতো) তাহলে সেই ব্যাক্তির শাস্তির মেয়াদ আরও কঠোর থেকে কঠোর হতে পারে।

দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারার উদাহরণ

পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামি অর্থাৎ থানার লকআপ থেকে পালিয়ে গেলে বা আদালতে আসামি হাজিরা দেওয়ার সময় হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে বা জেল থেকে পালিয়ে গেলে দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারা কার্যকর হবে। তবে পালানো সফল হওয়া জরুরি নয়,পালানোর চেষ্টা করাটা অপরাধ। তবে অন্য কেউ পালাতে সাহায্য করলে, তার বিরুদ্ধে অন্যান্য ধারার অপরাধ হয়, যেমন – ২২৫/২২৫বি প্রযোজ্য হবে।

দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৮ ধারার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারা

১.আইন অনুযায়ী গ্রেফতার প্রতিরোধ করা দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৪ ধারা

২.বন্দিকে পালাতে সহায়তা করা দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৫ ধারা

৩.গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আসামিকে পালাতে সাহায্য করা দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ২২৫বি ধারা

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারা

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮০ ধারা আদালত এর উপস্থিতিতে অপরাধ সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা দেয়, আদালতের সামনে বা আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন সময়ে সংঘটিত অবমাননা মূলক বা বিশৃঙ্খল আচরণের ঘটনা ঘটলে, বা ইচ্ছাকৃত ভাবে আদালত অবমাননা করে, বা অশালীন আচরণ করে, যে কাউকে হুমকি দেয় বা গালিগালাজ করে, তাহলে আদালত তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদান করতে পারেন।এই ক্ষেত্রে আলাদা মামলা বা দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে না।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারার শাস্তির বিধান

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারা অনুযায়ী আদালত দোষী ব্যাক্তি কে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ১ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দিতে পারেন। এই শাস্তি আদালত তাৎক্ষণিক ভাবে প্রদান করতে পারবেন।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারার উদাহরণ

আদালত চলাকালীন সময়ে বিচারকের সাথে দুর্ব্যবহার করা বা বিচার চলাকালীন চিৎকার বা হট্টগোল বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা বা সাক্ষীকে হুমকি দেওয়া বা বিচারক কে হুমকি দেওয়া বা আদালতের আদেশ অমান্য করা বা অশালীন আচরণ করা এই সব ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারা প্রযোজ্য হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারার উদ্দেশ্য

১.আদালতের মর্যাদা এবং শৃঙ্খলা রক্ষা করা

২.বিচারিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা

৩.আদালতের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখা

৪.আদালত চাইলে শাস্তি না দিয়ে অভিযুক্ত ব্যাক্তি কে ক্ষমা করতে পারবেন।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ধারা

১.কার্যবিধি ও লিখিত আদেশ ধারা ৪৮১ থেকে ৪৮০ ধারা

২.হাইকোর্ট বিভাগের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ৪৮২ ধারা

৩.বিচারিক কার্যক্রমে ইচ্ছাকৃত অপমান করা দণ্ডবিধি ২২৮ ধারা

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা 

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী, আদালত অবমাননার অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে তাকে যে শাস্তি দেওয়া হবে, তাহা আইনের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে থাকতে হবে। অর্থাৎ, আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে আদালত শাস্তি আইনের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারবে না, বরং এটি অধ্যাদেশ আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ। শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করার সময় অপরাধের প্রকৃতি, মাত্রা এবং প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা শাস্তির সীমা কী?

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী আদালত সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২,০০০৳ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড দিতে পারবেন। এটি আদালত অবমাননা করার জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তি।

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা প্রয়োগের উদাহরণ

বিচারকের প্রতি প্রকাশ্যে অশালীন ভাষা ব্যবহার বা বিচারাধীন মামলার বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বা আদালতকে হেয় করে কোনো বক্তব্য দেওয়া বা আদালতের আদেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করা, এই সব ক্ষেত্রে আদালত, আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারা অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন, তবে সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে থাকবেন।এই ধারা কেবল সব ধরনের আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। যদি অভিযুক্ত ব্যাক্তি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তাহলে আদালত চাইলে শাস্তি মাফ করতে পারেন।

অন্য পোস্ট – মোবাইল দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং সম্ভব কি?

আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ, ২০০৮ এর ১৩ ধারার সংশ্লিষ্ট আইন

  • ১.ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ৪৮০ ধারা
  • ২.দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ২২৮ ধারা
  • ৩.সুপ্রিম কোর্টের আদালত অবমাননার ক্ষমতা – সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৮

শেষ কথা ও মতামত 

আদালত অবমাননা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকবেন। আদালতে এজলাস চলাকালীন আপনার মামলার শুনানির সময় অতিরিক্ত কথা বলবেন না, কথা বলতে হলে আদালত বা আপনার আইনজীবীর অনুমতি সাপেক্ষে বলবেন।

Spread the love

Leave a Comment