০১:৫১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর করনীয় | আইন জানুন

  • Mithu Babu
  • Update Time : ০৭:০১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৪ Time View

স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর করনীয় | আইন জানুন

স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর করনীয় | আইন জানুন

নওগাঁ জজ কোর্টের বারান্দায় প্রতিদিন শত শত বিচারপ্রার্থী নারীর দীর্ঘশ্বাস শুনি। আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, অনেক বোন শুধু আইনের সঠিক তথ্য না জানার কারণে স্বামীর অন্যায় চুপচাপ সহ্য করেন। বিশেষ করে স্বামী যখন প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন স্ত্রী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন এবং ভাবেন তার বুঝি আর কিছুই করার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের আইন আপনাকে অত্যন্ত শক্তিশালী অধিকার দিয়েছে। আমার পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রতিবেদনে স্বামী তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করলে আইনত আপনি কী কী প্রতিকার পেতে পারেন তা তুলে ধরেছি।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে কি? এর উত্তর হচ্ছে—অবশ্যই লাগে। অনেক সময় স্বামীরা আইন ফাঁকি দিয়ে বিয়ে গোপন করেন, কিন্তু দণ্ডবিধি ও পারিবারিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী এর কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আমাদের জানা দরকার এই শাস্তির বিধানে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কী বলে।

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কি দণ্ডনীয় অপরাধ?

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ (৫) ধারা অনুযায়ী যদি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে বা সালিশি পরিষদের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করে, সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্বামী যদি কোনরূপ তথ্য গোপন করে বিয়ে কর, তাহলে তিনি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন করছে বলে গণ্য হবে। স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করার সময় প্রথম স্ত্রীর কথা দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে গোপন করেন তাহলে ওই দ্বিতীয় স্ত্রীও প্রতারণার অভিযোগে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

অন্য পোস্ট – কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? নিয়ম ও কাগজপত্র

আপনার আইনি অধিকার কি কি?

যদি আপনার স্বামী আপনার অনুমতি ছাড়া বা কোনরূপ তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে আপনি নিচে উল্লেখ করা বেশ কিছু প্রতিকার পেতে পারেন –
তাৎক্ষণিক দেনমোহর দাবিঃ বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকিবে। যদি তিনি দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আপনি পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর ও খোরপোশ আদায় করতে পারেন।
ফৌজদারি মামলাঃ আপনি দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা এবং ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা মতে স্বামীর বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করতে পারবেন। এই অপরাধে স্বামীর এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
খোরপোশ বা ভরণপোষণঃ দ্বিতীয় বিয়ের কারণে আপনি আলাদা থাকলেও স্বামী আপনার আজীবন ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকিবে। এমন কি আপনি যদি তালাকও না নেন, তাহলে ও পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর আওতায় ভরণপোষণের মামলা করতে পারবেন।
বিচ্ছেদ বা তালাকঃ আপনি যদি মনে করেন এই প্রতারণার পর আর সংসার করা সম্ভব নয়, তাহলে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী আপনি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।

নওগাঁ জজ কোর্টের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কিছু পরামর্শ

দীর্ঘদিন কোর্ট চত্বরে কাজ করতে গিয়ে আমি যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছি –
মামলা করার আগে অবশ্যই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার মেয়রের কাছে লিখিত আবেদন দিতে পারেন। অনেক সময় সেখান থেকেই সুষ্ঠু সমাধান পেতে পারেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এমন কাবিননামার কপি বা বিয়ের ছবি বা নির্ভরযোগ্য সাক্ষী সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন – যদি আপনি দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে সংসার করতে চান বা সংসার করতে পারেন তাহলে আইনী ঝামেলায় জড়াবেন না।

শেষ কথা ও মতামত

আপনার অধিকার রক্ষা করার জন্য আইন আছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া। নওগাঁ জজ কোর্টে আমরা প্রতিনিয়ত এমন বিচারপ্রার্থীদের সহযোগিতা করছি। কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে বা আইনি পরামর্শের প্রয়োজন হলে সরাসরি আপনার পরিচিত আইনজীবীর পরামর্শ নিন। এই প্রতিবেদন টি কেবলমাত্র সচেতনতার জন্য প্রকাশিত করা হয়েছে। আইনী কাজের পূর্বে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিবেন। এবং এই প্রতিবেদন টি শেয়ার করে সকল কে জানার সুযোগ করে দিন।

 

Spread the love

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

About Author Information

mithu Babu

স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর করনীয় | আইন জানুন

Update Time : ০৭:০১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

স্বামী গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করলে স্ত্রীর করনীয় | আইন জানুন

নওগাঁ জজ কোর্টের বারান্দায় প্রতিদিন শত শত বিচারপ্রার্থী নারীর দীর্ঘশ্বাস শুনি। আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, অনেক বোন শুধু আইনের সঠিক তথ্য না জানার কারণে স্বামীর অন্যায় চুপচাপ সহ্য করেন। বিশেষ করে স্বামী যখন প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে বা গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তখন স্ত্রী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন এবং ভাবেন তার বুঝি আর কিছুই করার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের আইন আপনাকে অত্যন্ত শক্তিশালী অধিকার দিয়েছে। আমার পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এই প্রতিবেদনে স্বামী তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করলে আইনত আপনি কী কী প্রতিকার পেতে পারেন তা তুলে ধরেছি।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে কি? এর উত্তর হচ্ছে—অবশ্যই লাগে। অনেক সময় স্বামীরা আইন ফাঁকি দিয়ে বিয়ে গোপন করেন, কিন্তু দণ্ডবিধি ও পারিবারিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী এর কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। আমাদের জানা দরকার এই শাস্তির বিধানে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন কী বলে।

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে কি দণ্ডনীয় অপরাধ?

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ (৫) ধারা অনুযায়ী যদি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে বা সালিশি পরিষদের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে দ্বিতীয় বিয়ে করে, সেটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্বামী যদি কোনরূপ তথ্য গোপন করে বিয়ে কর, তাহলে তিনি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন করছে বলে গণ্য হবে। স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করার সময় প্রথম স্ত্রীর কথা দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে গোপন করেন তাহলে ওই দ্বিতীয় স্ত্রীও প্রতারণার অভিযোগে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

অন্য পোস্ট – কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? নিয়ম ও কাগজপত্র

আপনার আইনি অধিকার কি কি?

যদি আপনার স্বামী আপনার অনুমতি ছাড়া বা কোনরূপ তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে আপনি নিচে উল্লেখ করা বেশ কিছু প্রতিকার পেতে পারেন –
তাৎক্ষণিক দেনমোহর দাবিঃ বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করার সাথে সাথে প্রথম স্ত্রীর সম্পূর্ণ দেনমোহর পরিশোধ করতে বাধ্য থাকিবে। যদি তিনি দিতে অস্বীকার করে, তাহলে আপনি পারিবারিক আদালতে মামলা করে দেনমোহর ও খোরপোশ আদায় করতে পারেন।
ফৌজদারি মামলাঃ আপনি দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা এবং ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা মতে স্বামীর বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করতে পারবেন। এই অপরাধে স্বামীর এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
খোরপোশ বা ভরণপোষণঃ দ্বিতীয় বিয়ের কারণে আপনি আলাদা থাকলেও স্বামী আপনার আজীবন ভরণপোষণ দিতে বাধ্য থাকিবে। এমন কি আপনি যদি তালাকও না নেন, তাহলে ও পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর আওতায় ভরণপোষণের মামলা করতে পারবেন।
বিচ্ছেদ বা তালাকঃ আপনি যদি মনে করেন এই প্রতারণার পর আর সংসার করা সম্ভব নয়, তাহলে ১৯৩৯ সালের মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন অনুযায়ী আপনি বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।

নওগাঁ জজ কোর্টের অভিজ্ঞতা থেকে আমার কিছু পরামর্শ

দীর্ঘদিন কোর্ট চত্বরে কাজ করতে গিয়ে আমি যা দেখেছি, তার ভিত্তিতে কিছু ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছি –
মামলা করার আগে অবশ্যই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার মেয়রের কাছে লিখিত আবেদন দিতে পারেন। অনেক সময় সেখান থেকেই সুষ্ঠু সমাধান পেতে পারেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এমন কাবিননামার কপি বা বিয়ের ছবি বা নির্ভরযোগ্য সাক্ষী সংগ্রহ করার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন – যদি আপনি দ্বিতীয় স্ত্রীর সাথে সংসার করতে চান বা সংসার করতে পারেন তাহলে আইনী ঝামেলায় জড়াবেন না।

শেষ কথা ও মতামত

আপনার অধিকার রক্ষা করার জন্য আইন আছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া। নওগাঁ জজ কোর্টে আমরা প্রতিনিয়ত এমন বিচারপ্রার্থীদের সহযোগিতা করছি। কোনো কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে বা আইনি পরামর্শের প্রয়োজন হলে সরাসরি আপনার পরিচিত আইনজীবীর পরামর্শ নিন। এই প্রতিবেদন টি কেবলমাত্র সচেতনতার জন্য প্রকাশিত করা হয়েছে। আইনী কাজের পূর্বে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিবেন। এবং এই প্রতিবেদন টি শেয়ার করে সকল কে জানার সুযোগ করে দিন।

 

Spread the love