জমির ভুয়া দলিল বাতিল ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন
ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা আমাদের সমাজে এক অতি পরিচিত সমস্যা। একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে নওগাঁ জজ কোর্টে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুবাদে আমি দেখেছি, সঠিক আইনি জ্ঞানের অভাবে সাধারণ মানুষ জমি নিয়ে কতটা ভোগান্তিতে পড়েন। অনেক সময় জাল দলিল তৈরি করে জমির দখল নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, আবার কখনো পেশী শক্তি ব্যবহার করে মালিকানা দাবি করা হয়।
সম্প্রতি আমার হাতে আসা একটি বিশেষ মামলার আরজি পর্যবেক্ষণ করে, আমি জমি রক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক লক্ষ্য করেছি। আজ আমি আমার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই আপনাদের সাথে শেয়ার করবো যে, যদি আপনার অজান্তে কেউ ভুয়া দলিল তৈরি করে বা আপনার সম্পত্তি থেকে আপনাকে বেদখল করার হুমকি দেয়, তবে কীভাবে দলিল বাতিলের মামলা এবং অর্ডার ৩৯ রুল ১ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নিজের অধিকার সুরক্ষা করবেন। এই বাস্তব মামলাটির প্রতিটি ধাপ আপনাদের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন নিচে তুলে ধরা হলো –
মোকাম বিজ্ঞ সাপাহার সিভিল জজ আদালত, নওগাঁ।
মোকদ্দমা নং- ০০x/২৬ দলিল রদ
দরখাস্তকারী/বাদী | বনাম | প্রতিপক্ষ/বিবাদী |
|---|---|---|
১। মোঃ…………… | ১। মোসাঃ………….. | |
পিতা-……………… | পিতা-……………. | |
সাং- মাইপুর | সাং- নিশ্চিন্তপুর | |
পোঃ নিশ্চিন্তপুর | পোঃ নিশ্চিন্তপুর | |
থানা- সাপাহার | থানা- সাপাহার | |
জেলা- নওগাঁ | জেলা- নওগাঁ। | |
এনআইডি নং- xxxxxxxxxx | ||
মোবাঃ ০১৫৭৫-xxxxxx |
বাদী/দরখাস্তকারী পক্ষে প্রতিপক্ষ/বিবাদীগণের বিরুদ্ধে দেঃ কাঃ বিঃ আইনের অর্ডার ৩৯ রুল ১ মতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনা:-
নিবেদন এই যে, অত্রাদালতের এলাকাধীন সাবেক জেলা- রাজশাহী হাল জেলা- নওগাঁ, থানা- সাপাহার, মৌজা- মাইপুর মধ্যে তপশীল বর্ণিত আরএস……. নং খতিয়ানের মূল মালিক প্রজা………….. নামে ১/৫ গোন্ডা, ময়েন উদ্দিন ১/৫ গোন্ডা, কায়েম উদ্দিন নামে ১/৫ গোন্ডা, নৈমদ্দিন নামে ২।। ধলা মন্ডল নামে ২।। তিল অংশে রেকর্ড প্রস্তুত ও প্রচারিত আছে বটে। উক্ত খতিয়ানের প্রজা বিক্রয় করিলে তাহা বাদী ক্রয় করে শান্তি পূর্ণ ভাবে দখল ভোগ করাকালে বাদী তার নিজ নামে xxxx/২৪-২৫ নং খারিজ কেস মূলে নিজ নামে খারিজ করেন এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে অদ্যতক পর্যন্ত দখল ভোগে আছেন। বাদী নালিশী সম্পত্তি শান্তিপূর্ণ ভাবে দখল ভোগ করাকালে গত ইং ০৫/০১/২৬ তারিখে বিবাদী হুমকী প্রদর্শন করিয়াছেন যে, নালিশী সম্পত্তি দখল তার বরাবরে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বাদী এর কারণ জিজ্ঞাসা করিলে বিবাদী জানায় যে, তার নামে দলিল করিয়াছে। তৎপর বাদী সাপাহার সাবরেজিঃ অফিস খোজ করিয়া গত ইং ০৮/০১/২৬ তারিখে xxxx/২৪ দলিল এর সন্ধান পান। তৎপর উক্ত তারিখে দলিলের জাবেদা নকল উঠাইয়া বাদী সর্ব প্রথম অবগত হন যে বাদী দাতা এবং বিবাদী গ্রহিতা হিসাবে দলিল সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছে যাহা বাদী অবগত নহে। মূলত বাদী নাম ব্যবহার করিয়া অন্য লোককে দাতা সাজিয়ে যোগসাজসী আদান প্রদান বিহীন অন্য লোককে দাতা সাজাইয়া নাম টিপ সহি ছবি ব্যবহার করিয়া বিবাদী বাদীর স্ত্রী থাকা সময়ে অতি গোপনে দলিল সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছে জন্য উক্ত দলিল দ্বারা বাদী বাধ্য নয় মর্মে এবং নালিশী সম্পত্তি বিবাদী কোন স্বত্ব দখল নাই বা থাকিবার কোন কারন নেই। সে কারণে গত ইং ২৩/১০/২৪ তারিখে xxxx/২৪ নং দলিল বাদী রদ রহিতের মামলা করিলেন। উক্ত মামলা করায় উক্ত মূল মোকদ্দমা নোটিশ প্রাপ্ত হইয়া প্রতিপক্ষ তথা ১নং বিবাদী মোকদ্দমার বিষয় জানিয়া দরখাস্তকারীকে নালিশী সম্পত্তি হইতে বেদখল করিবার জন্য গত ইং ১৩/০১/২০২৬ তারিখ রোজ মঙ্গলবার তারিখে সকাল ৮.০০ টায় এই মর্মে হুমকী প্রদান করিয়াছেন যে, প্রতিপক্ষগণ পেশী শক্তি বলে বেআইনী ভাবে অনুপ্রবেশ করিয়া মাটিকাটিয়া গর্ত করিবে, আকৃতি পরিবর্তন করিবে মর্মে হুমকী দিয়া সেই হুমকী অদ্যতক বহাল রহিয়াছে। উক্তরূপ হুমকী বহাল থাকিলে আইন শৃঙ্খলার অবনতি হইবে। সে কারণে দরখাস্তকারী বাধ্য হইয়া প্রতিপক্ষগণ যাহাতে নালিশী সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশ করিতে না পারে সম্পত্তি আকৃতি প্রকৃতি পরিবর্তন করিতে না পারে কিংবা বাদীকে নালিশী সম্পত্তি হইতে বেদখল করিতে না পারে তজ্জন্য দরখাস্তকারী নিরুপায় হইয়া অত্র দরখাস্ত আনয়ন করিতেছেন বটে।
অন্য পোস্ট – কোর্ট ম্যারেজ করতে কত টাকা লাগে? নিয়ম ও কাগজপত্র
বিধায় প্রার্থনা হুজুর উপরোক্ত কারণ ও অবস্থাধীনে ন্যায় বিচারের স্বার্থে অত্র দরখাস্তের তপশীল বর্ণিত সম্পত্তি ভোগ দখলে দরখাস্তকারীকে বাধা বিঘ্নের সৃষ্টি করিতে না পারে বা আরজীর তফশীল বর্ণিত সম্পত্তিতে প্রতিপক্ষগণ চাষাবাদ করিতে না পারে বা বে আইনী ভাবে নালিশী সম্পত্তিতে ১ নং প্রতিপক্ষগণ জোর পূর্বক দরখাস্তকারীর সম্পত্তি হইতে বে-দখল করিতে না পারে বা সম্পত্তির আকার আকৃতি পরিবর্তন করিতে না পারে বা দরখাস্তের তপশীল বর্ণিত সম্পত্তি অন্যত্র বিক্রয় করিতে না পারে তজ্জন্য মূল মোকদ্দমা চলাতক বর্ণিত প্রতিপক্ষ/বিবাদীগণের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও দোতরফা শুনানীতক অন্তবর্তীকালিন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দানে সুবিচার করিতে মর্জি হয়। ইতি তাং
তপশীল পরিচয়
জেলা সাবেক- রাজশাহী, হাল জেলা- নওগাঁ, সাবেক থানা- পোরশা, থানা- সাপাহার, মৌজা-মাইপুর, জেএল নং ৫৯
খং নং | দাগ নং | রকম | পরিমান |
|---|---|---|---|
আরএস-০x | ৩৩২ | ডাঙ্গা | ৪১ শং কাতে ৩৩৯০ বর্গলিং পশ্চিমাংশে |
প্রস্তাবিত-xxx | যাহার পূর্বাংশে…….. | ||
পশ্চিমে-………. | |||
উত্তরে-………… | |||
দক্ষিণে- রাস্তা |
সত্যপাঠ
অত্র দরখাস্তের সকল বিবরণ সমূহ আমার জ্ঞান, বিশ্বাস ও অবগতি মতে সত্য জানিয়া নিজ নাম সহি সম্পাদন করিলাম। ইতি, তাং ১৫/০১/২৬ ইং
(স্বাক্ষর)
……………..
নালিশী সম্পত্তিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কেন প্রয়োজন? একটি বাস্তব আরজি বিশ্লেষণ ও আইনি পরামর্শ
নওগাঁ জজ কোর্টে আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করার সুবাদে জমি-জমা সংক্রান্ত অসংখ্য জটিলতা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, প্রতিপক্ষ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া দলিল তৈরি করে এবং পরবর্তীতে গায়ের জোরে প্রকৃত মালিককে বেদখল করার চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় আদালত কেন এবং কোন যুক্তিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন, তা আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
অন্য পোস্ট – জমি অন্যের দখলে থাকলে উদ্ধারের আইনি উপায় | একটি পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
আমার হাতে থাকা সাম্প্রতিক একটি মামলার আরজি (মোকদ্দমা নং- xx/২৬, সাপাহার সিভিল জজ আদালত) পর্যালোচনা করলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
আরজি অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা কেন দেওয়া উচিত?
উক্ত আরজিটি বিশ্লেষণ করে আমি পাঁচটি প্রধান কারণ খুঁজে পেয়েছি যার ভিত্তিতে আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন:
শান্তিপূর্ণ দখল বজায় রাখা: বাদী আরএস ০x নং খতিয়ান মূলে জমি ক্রয় করে এবং সরকারিভাবে খারিজ সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোগদখল করে আসছেন। আইন অনুযায়ী, যিনি দখলে আছেন, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার দখল বজায় রাখাই ন্যায় বিচার।
জালিয়াতি ও প্রতারণা রোধ: আরজিতে দেখা যায়, বিবাদীপক্ষ বাদীর স্ত্রী থাকা অবস্থায় অতি গোপনে অন্যকে দাতা সাজিয়ে ও টিপসহি ব্যবহার করে একটি ভুয়া দলিল (নং xxxx/২৪) সৃষ্টি করেছে। যেহেতু এই দলিলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং এটি নিয়ে মূল মামলা চলমান, তাই এই দলিলের ভিত্তিতে বিবাদী যাতে কোনো সুবিধা না পায়, সেজন্যই নিষেধাজ্ঞা জরুরি।
বেদখল ও অনধিকার প্রবেশ রোধ: বিবাদীপক্ষ গত ১৩/০১/২০২৬ তারিখে পেশী শক্তি ব্যবহার করে জমিতে অনধিকার প্রবেশের এবং বাদীকে বেদখল করার হুমকি প্রদান করেছে। আদালত যদি এখানে হস্তক্ষেপ না করেন, তবে বাদীর অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সম্পত্তির আকৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা: বিবাদীপক্ষ জমিতে মাটিকাটা বা গর্ত করার মাধ্যমে জমির শ্রেণি বা আকৃতি পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছে। অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ থাকলে বিবাদীপক্ষ মামলার শুনানি চলাকালীন জমির কোনো আকার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।
তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা: অনেক সময় নালিশী সম্পত্তি মামলা চলাকালীন অন্যত্র বিক্রয় করার চেষ্টা করা হয়। আরজির প্রার্থনা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা থাকলে বিবাদীপক্ষ এই সম্পত্তি অন্য কারো কাছে হস্তান্তর বা বিক্রয় করতে পারবে না।
আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমার বিশেষ পরামর্শ
আপনারা যারা একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু পরামর্শ দিচ্ছি:
১. তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ: যদি বুঝতে পারেন আপনার জমির কোনো জাল দলিল তৈরি হয়েছে, তবে বসে না থেকে দ্রুত দলিল রদের (Cancellation of Deed) মামলা করুন।
২. অর্ডার ৩৯ রুল ১-এর প্রয়োগ: মামলার সাথে সাথেই দেওয়ানী কার্যবিধির অর্ডার ৩৯ রুল ১ ও ২ অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন দাখিল করুন। এটি আপনাকে তাৎক্ষণিক আইনি সুরক্ষা দেবে।
৩. দলিলপত্র গুছিয়ে রাখা: আরজিতে যেমন টি দেখা গেছে—খতিয়ান, খারিজ কেস নম্বর এবং ডিসিআর (DCR) সব সময় হালনাগাদ রাখুন। কারণ আদালতের কাছে আপনার প্রাথমিক স্বত্ব (Prima Facie Case) প্রমাণের জন্য এগুলোই প্রধান অস্ত্র।
৪. হুমকির প্রমাণ: বিবাদীপক্ষ কখন এবং কীভাবে আপনাকে হুমকি দিয়েছে, তার সঠিক তারিখ ও সময় আরজিতে উল্লেখ করা জরুরি।
৫. অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা: বিবাদী পক্ষ জবাব দাখিলের জন্য যদি সময় নিয়ে তফসিল বর্ণিত সম্পত্তি আকার পরিবর্তন করার চেষ্টা করে বা বেদখল করার চেষ্টা করে বা কোন প্রকার অপচেষ্টা করে তাহলে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মতোই বিবাদী পক্ষে জবাব দাখিল না করা পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার জন্য বিজ্ঞ আদালতে আবেদন করিবেন। আদালত অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন মঞ্জুর করিলে, বিবাদী পক্ষ জবাব দাখিল না করা পর্যন্ত আপনার পক্ষে অন্তবর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ হয়ে থাকবে। এটি আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।
পরিশেষে: জমি যার, দলিল যার – আইন তার পক্ষেই থাকে। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। নওগাঁ জজ কোর্টের একজন আইনজীবী সহকারী হিসেবে আমি বলবো, আপনার সম্পদ রক্ষায় আদালতের আশ্রয় নিতে দ্বিধা করবেন না। এবং এই প্রতিবেদন টি শেয়ার করে অন্য কে সচেতন করুন।

Mithu Babu 
















